👨🦱 ধারা টিভি নিউজ প্রতিবেদন
🔰প্রকাশ : ১৩ জুন ২০২৬, ০৩:১৩ পিএম | অনলাইন সংস্করণ
জীবনের কিছু ঘটনা মানুষকে নতুন করে জীবন, সম্পর্ক এবং মানবতার অর্থ শেখায়। আমার জীবনের সাম্প্রতিক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনাটি ছিল তেমনই একটি নির্মম বাস্তবতা, যা আমাকে একদিকে মৃত্যুর খুব কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছিল, অন্যদিকে মানুষের প্রকৃত পরিচয় চিনিয়ে দিয়েছে।
একসময় আমিও বিশ্বাস করতাম, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পরিচিতজন এবং সমাজের প্রভাবশালী মানুষরাই জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। সামাজিক অনুষ্ঠান, বিভিন্ন কর্মকাণ্ড এবং বড় বড় আশ্বাস শুনে মনে হতো, বিপদের দিনে নিশ্চয়ই তারা পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে শুয়ে আমি উপলব্ধি করেছি—বিপদই মানুষের আসল পরিচয়পত্র।
দুর্ঘটনার পর গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে আমাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি ঘটলে পরবর্তীতে ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর)-এ স্থানান্তর করা হয়। ইতোমধ্যে আমার তিনটি বড় ও জটিল অস্ত্রোপচার সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, সামনে আরও কয়েকটি জটিল অপারেশন এবং প্রয়োজনে প্লাস্টিক সার্জারিরও প্রয়োজন হতে পারে। দীর্ঘ এই চিকিৎসা যাত্রা এখনও শেষ হয়নি।
এই কঠিন সময়ে সবার আগে যে মানুষটি আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, সে আমার বড় ছেলে জন সাব্বির রানা। দুর্ঘটনার সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সে ছুটে আসে। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা থেকে শুরু করে আমাকে ঢাকায় স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা, চিকিৎসার প্রতিটি ধাপে ছায়ার মতো পাশে থাকা এবং নিজের ভবিষ্যতের কথা না ভেবে নিজের ব্যাংক হিসাবের সঞ্চিত অর্থ পর্যন্ত আমার চিকিৎসার পেছনে ব্যয় করা—সবকিছুই সে নিঃস্বার্থভাবে করেছে। একজন বাবা হিসেবে তার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা, ভালোবাসা এবং গর্ব ভাষায় প্রকাশের ঊর্ধ্বে।
আমি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি যশোরের মাননীয় জেলা প্রশাসক জনাব মোহাম্মদ আশেক হাসানকে। সরকারি দায়িত্বের ব্যস্ততার মাঝেও তিনি আমার খোঁজখবর নিয়েছেন এবং মানবিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে আমাকে সাহস জুগিয়েছেন।
একইভাবে আমি কৃতজ্ঞ যশোরের মাননীয় পুলিশ সুপার জনাব সৈয়দ রফিকুল ইসলাম-এর প্রতি। তাঁর আন্তরিকতা, মানবিকতা এবং সহমর্মিতা আমাকে নতুন করে আশাবাদী করেছে।
বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানাই মনিরামপুর উপজেলার মানবিক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব মোঃ সম্রাট হোসেন-এর প্রতি। তিনি শুধু একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা নন, একজন সহানুভূতিশীল মানুষ হিসেবেও আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর উৎসাহ, খোঁজখবর এবং সহযোগিতা আমাকে মানসিকভাবে শক্তি জুগিয়েছে।
আমি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি যশোরের বিশিষ্ট মোবাইল ব্যবসায়ী জনাব জাকির হোসেন পলাশ-এর প্রতি। তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী হওয়ার পাশাপাশি একজন মানবিক মানুষ হিসেবেও আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর সহযোগিতা, সহমর্মিতা এবং উৎসাহ আমার চিকিৎসা সংগ্রামের পথে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হয়ে রয়েছে।
একইসঙ্গে কৃতজ্ঞতা জানাই ঝিকরগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জনাব গেলাম কিবরিয়া হাসান-এর প্রতি, যিনি মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে আমার খোঁজখবর নিয়েছেন এবং সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন।
আমার এই কঠিন সময়ে সাংবাদিক সমাজ থেকেও পেয়েছি অসাধারণ সহযোগিতা। বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা জানাই যশোরের সাংবাদিক নেতা ও দৈনিক মানবজমিনের স্টাফ রিপোর্টার নূর ইসলাম, দৈনিক জন্মভূমির জেলা প্রতিনিধি শহীদ জয়, চ্যানেল আইয়ের জেলা প্রতিনিধি ও যশোর ইউনিয়ন অব জার্নালিস্টস (জেইউজে)-এর সভাপতি মোঃ আকরাম হোসেন, মণিরামপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি এসএম মজনুর রহমান এবং সাপ্তাহিক পল্লীকথা পরিবারের অন্যতম কর্ণধার দেব্রত ঘোষসহ যশোরের অসংখ্য সাংবাদিক বন্ধুদের প্রতি। তাঁরা সংবাদ প্রচার, জনসচেতনতা সৃষ্টি, সহযোগিতা সংগ্রহ এবং আমার চিকিৎসার জন্য মানুষের সহানুভূতি ও সমর্থন আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁদের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও আন্তরিক সহযোগিতা আমি কখনো ভুলব না।
আমি গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি ঢাকায় অবস্থানরত আমার সাংবাদিক বন্ধু, সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদেরও। কেউ হাসপাতালে এসে খোঁজ নিয়েছেন, কেউ ফোন করে সাহস জুগিয়েছেন, কেউ সংবাদ প্রচারের মাধ্যমে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন, কেউ আবার নীরবে আর্থিক সহায়তা করেছেন। তাঁদের প্রত্যেকের প্রতি আমি আজীবন কৃতজ্ঞ।
আমার হৃদয় সবচেয়ে বেশি স্পর্শ করেছে সমাজের সেই অবহেলিত মানুষেরা, যাদের কাছ থেকে আমি কোনোদিন কিছু প্রত্যাশা করিনি। বিশেষ করে যশোরের এক প্রতিবন্ধী, ভূমিহীন, বিধবা ভিক্ষুক নারী, যিনি নিজের সীমাহীন অভাব-অনটনের মধ্যেও তাঁর সঞ্চিত ভিক্ষার অর্থ আমার চিকিৎসার জন্য দান করেছেন। তাঁর এই মানবিকতা, আত্মত্যাগ এবং ভালোবাসা আমাকে বুঝিয়েছে—মানুষের প্রকৃত সম্পদ অর্থ বা ক্ষমতা নয়, হৃদয়ের মহত্ত্ব।
একইভাবে আমি কৃতজ্ঞ সেই সকল রক্তযোদ্ধা বন্ধুদের প্রতি, যারা নিজেদের মূল্যবান রক্ত দিয়ে আমার জীবন বাঁচানোর সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন। তাঁদের এই অবদান শুধু চিকিৎসা সহায়তা নয়, এটি মানবতার সর্বোচ্চ প্রকাশ। তাঁরা আজীবনের জন্য আমার হৃদয়ের আত্মীয় হয়ে থাকবেন।
এই কঠিন সময়ে আমি আরেকটি সত্য উপলব্ধি করেছি—রক্তের সম্পর্ক সবসময় আপনজনের পরিচয় দেয় না। অনেক আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিত মানুষ, যাদের কাছে আমি অনেক প্রত্যাশা করেছিলাম, তারা নীরব থেকেছেন। কেউ ব্যস্ততার অজুহাত দিয়েছেন, কেউ খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজনও মনে করেননি। অথচ অনেক অপরিচিত মানুষ, সাধারণ মানুষ, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং মানবিক হৃদয়ের মানুষ আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। তাঁদের কেউ অর্থ দিয়েছেন, কেউ সাহস দিয়েছেন, কেউ ভালোবাসা দিয়েছেন, কেউ শুধু একটি ফোন করে বলেছেন, “ভয় পাবেন না, আমরা আছি।” সেই কথাগুলো আমার কাছে অমূল্য সম্পদ।
আজ আমি উপলব্ধি করছি, জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ অর্থ নয়, পরিচিতির সংখ্যা নয়, সামাজিক মর্যাদাও নয়। প্রকৃত সম্পদ হলো কিছু মানবিক মানুষ, যারা বিনিময়ের কোনো প্রত্যাশা ছাড়াই বিপদের দিনে পাশে দাঁড়ায়।
আমার চিকিৎসার পথ এখনও শেষ হয়নি। সামনে আরও অপারেশন, আরও চিকিৎসা, আরও চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। কিন্তু আমি ভেঙে পড়ি না। কারণ আমি জানি, মহান আল্লাহর অশেষ রহমতের পাশাপাশি অসংখ্য মানুষের দোয়া, ভালোবাসা, সহযোগিতা এবং শুভকামনা আমার সঙ্গে রয়েছে।
আমি হয়তো কোনোদিন এই ঋণ শোধ করতে পারব না। কিন্তু যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিন কৃতজ্ঞ হৃদয়ে আপনাদের প্রত্যেককে স্মরণ করব। আপনারা শুধু একজন আহত মানুষকে সাহায্য করেননি; আপনারা আমাকে নতুন করে বাঁচার সাহস দিয়েছেন, মানুষের প্রতি বিশ্বাস ফিরিয়ে দিয়েছেন এবং প্রমাণ করেছেন—মানবতা এখনও পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শক্তি।
সকলের প্রতি আমার অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে অকৃত্রিম শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, দোয়া এবং আজীবনের কৃতজ্ঞতা রইল।
✍️ প্রতিবেদক:
— জেমস আব্দুর রহিম রানা
সিনিয়র সাংবাদিক
মনিরামপুর, যশোর।
বর্তমানে চিকিৎসাধীন-
গ্রীন-২ ইউনিট, ইএফ ওয়ার্ড, বেড নং-২৮
জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্র (নিটোর), ঢাকা
মোবাইল: ০১৩০০৮৩২৮৬৮।

0 মন্তব্যসমূহ